ভূমিকা
কাব্বালা (Kabbalah) ইহুদিবাদের গভীরতম আধ্যাত্মিক ও রহস্যবাদী (Mystical) ধারা। এটি ঈশ্বর, সৃষ্টিজগত, মানব আত্মা এবং মহাবিশ্বের গোপন কাঠামো ব্যাখ্যা করার একটি বৌদ্ধিক–আধ্যাত্মিক দর্শন। কাব্বালার মতে, তোরাহ ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি অংশের মধ্যে লুকানো আছে “ঈশ্বরের রহস্য”— যা কেবল যোগ্য সাধকেরাই উপলব্ধি করতে পারে।
কাব্বালার জন্ম ও ঐতিহাসিক শিকড়
কাব্বালার শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় ইহুদিবাদের প্রাচীন রহস্যবাদ – মেরকাবাহ (Merkabah) Mysticism-এ; যেখানে নবী ইজেকিয়েলের বর্ণিত ঈশ্বরীয় রথের (Divine Chariot) দর্শন নিয়ে গভীর ধ্যান করা হতো।
কিন্তু কাব্বালা একটি আনুষ্ঠানিক ধারায় রূপ পায় ১২–১৩ শতকে, বিশেষত স্পেনের ইহুদি পণ্ডিতদের মাধ্যমে।
এর সবচেয়ে প্রভাবশালী গ্রন্থ হলো:
“Zohar – The Book of Splendor”
লেখক হিসেবে সাধারণত উল্লেখ করা হয়:
রাব্বি শিমন বার ইয়োখাই, তবে বেশির ভাগ গবেষক মনে করেন, এটি রচনা করেন ১৩শ শতকের স্প্যানিশ পণ্ডিত মোশে দে লেওন (Moses de León)।
কাব্বালার মূল দর্শন ও রহস্যবাদ
কাব্বালার ধর্মতত্ত্ব অত্যন্ত জটিল; তবে এর প্রধান ধারণাগুলো:
ঈশ্বরের সত্তা
কাব্বালায় ঈশ্বরকে বলা হয় Ein Sof — অর্থ “অসীম”, “সীমাহীন”।
মানুষ ঈশ্বরকে পুরোপুরি জানতে পারে না, কেবল তাঁর প্রকাশিত রূপগুলো উপলব্ধি করতে পারে।
সেফিরোট (Sefirot) – ঈশ্বরীয় শক্তির ১০টি স্তর
বিশ্বজগত সৃষ্টি হয়েছে ঈশ্বরের শক্তি ১০টি স্তর বা রূপের মাধ্যমে। এগুলোকে বলা হয়:
- Keter (মুকুট) – ঈশ্বরের ইচ্ছা
- Chokhmah – জ্ঞান
- Binah – বোধ
- Chesed – দয়া
- Gevurah – ন্যায়/শক্তি
- Tiferet – সৌন্দর্য
- Netzach – বিজয়
- Hod – মহিমা
- Yesod – ভিত্তি
- Malkhut – রাজত্ব/জগত
এই ১০ সেফিরোটের সমন্বয়ে বিশ্ব সৃষ্টি, মানব আত্মার গঠন ও নৈতিকতার পূর্ণ চিত্র তৈরি হয়।
Tikkun Olam – পৃথিবীকে শুদ্ধ করার সাধনা
মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য হলো—
🔹 সৎকর্মের মাধ্যমে বিশ্বকে বিশুদ্ধ করা।
🔹 ভেঙে যাওয়া ঈশ্বরীয় আলোকে পুনরায় সমন্বিত করা।
এটাই কাব্বালার নৈতিক ও মানবিক দিক।
দিব্য আলো (Divine Light)
সৃষ্টিজগতের প্রতিটি কণায় ঈশ্বরীয় আলো ছড়িয়ে আছে। মানুষ যখন জ্ঞান ও সৎকর্ম অর্জন করে, তখন সে এই আলোর সঙ্গে যুক্ত হয়।
কাব্বালার ধর্মীয় চর্চা
কাব্বালা বিমূর্ত দার্শনিক ধারণা হলেও এর কিছু চর্চা রয়েছে:
- তোরাহের অক্ষর ও সংখ্যার গূঢ় অর্থ বিশ্লেষণ
- জেমাত্রিয়া (Gematria)—হিব্রু অক্ষরের সংখ্যাগত মান দিয়ে রহস্য ব্যাখ্যা
- ধ্যান ও গভীর তওবা
- ঈশ্বরের বিভিন্ন নামের আধ্যাত্মিক অধ্যয়ন
- আত্মার পরিশুদ্ধি
- সেফিরোট নিয়ে কন্টেমপ্লেটিভ মেডিটেশন
তবে এটিকে যাদুবিদ্যা নয়— বরং আত্মিক উপলব্ধি অর্জনের উচ্চতর জ্ঞান হিসেবে দেখা হয়।
বিতর্ক, ভুল ধারণা ও জনপ্রিয় সংস্কৃতি
সাম্প্রতিক শতকে কাব্বালা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, বিশেষত পশ্চিমা বিশ্বে “Mysticism” বা “Occult” ধারার মধ্যে।
কিছু সেলিব্রিটি (যেমন ম্যাডোনা) কাব্বালা চর্চা করার কথা বলায় এটি আরও আলোচনায় আসে; কিন্তু রক্ষণশীল ইহুদিরা মনে করেন—
“সত্যিকারের কাব্বালা শিখতে হলে পবিত্র জীবনযাপন, তোরাহ–তালমুদের গভীর জ্ঞান, ও আধ্যাত্মিক শুদ্ধতা অপরিহার্য।”
অনেক সময় বাণিজ্যিকভাবে ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে কাব্বালাকে তাবিজ বা ম্যাজিকের মতো করে দেখানো হয়, যা মূল কাব্বালার পরিপন্থী।
আধুনিক প্রভাব
আজও কাব্বালা ইহুদিবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক ধারা—
বিশেষত:
- হাসিদিক ইহুদিধারা (Hasidism)
- ইসরায়েলের ধর্মীয় মঠসমূহ
- ইউরোপ ও আমেরিকার Mysticism স্টাডিজ
কাব্বালার শিক্ষায় নৈতিকতা, ধ্যান এবং সৃষ্টিজগতের দার্শনিক ব্যাখ্যা জোরালোভাবে উপস্থিত।
উপসংহার
কাব্বালা শুধু রহস্যবাদ নয়—
এটি ইহুদিবাদের আত্মিক ও বৌদ্ধিক গভীরতা।
এর মাধ্যমে ইহুদিরা বোঝার চেষ্টা করে:
- ঈশ্বর কে,
- বিশ্ব কেন বিদ্যমান,
- মানুষের আত্মা কোথা থেকে এসেছে,
- এবং কীভাবে সৎকর্মের মাধ্যমে বিশ্বকে পুনরায় শুদ্ধ করা যায়।
কাব্বালা তাই ইহুদি ধর্মের হৃদয়ের সবচেয়ে গোপন দরজা— যেখানে দর্শন, আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিকতা একসূত্রে বাঁধা।








Leave a Reply